✨ GEMINI LIVE
🗓️ --
-- : -- : -- --

আফফান লাবীব

লাবীবের খেরোখাতা · চিন্তা ও পাঠের নিভৃত আঙিনা

ইয়াজিদ: ব্যক্তি ও শাসক

আফফান লাবীব আফফান লাবীব আফফান লাবীব
আফফান লাবীব তাখাসসুস ফিল আদব ও ইসলামিক স্টাডিজ
· ৩১ মিনিটে পাঠ্য · 👁️ --

হিজরী প্রথম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং সমালোচিত যে নামটি তিনি হলেন সাইয়েদুনা মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর ছেলে ইয়াজিদ।
দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর অত্যন্ত সফলতার সাথে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে মুয়াবিয়ার রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পুত্র ইয়াজিদের কাঁধে এই গুরুদায়িত্ব সঁপে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নেতৃত্ব গুণ বা দ্বীনদারিতা উভয় ক্ষেত্রেই ইয়াজিদের চাইতে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের উপস্থিতি সত্ত্বেও তিনি স্বীয় পুত্রের কাঁধে এই দায়িত্ব অর্পণ করেন অন্য আরেকটি বৃহত্তর স্বার্থের প্রতি লক্ষ্য রেখে। ইবনে খালদুন রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার মুকাদ্দিমায় এই সিদ্ধান্তের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন— ‘যে বিষয়টা মুআবিয়া রা.কে অন্যদের স্থলে ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা বানাতে তৎপর করে, তা ছিল উম্মতের ঐক্য ও ঐকমত্যের স্বার্থ। বনু উমাইয়্যার ব্যবস্থাপনা পরিষদ এতে একমত ছিল। ওই সময় তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কারও ওপর সম্মত ছিল না। তারা কুরাইশের সবচেয়ে সুদৃঢ় শাখা ছিল। আর জাতির অধিকাংশই তাদের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এ জন্য মুআবিয়া রা. ইয়াযিদকে প্রাধান্য দিলেন এবং উত্তমের স্থলে অনুত্তমকে বেছে নিলেন। এটা ঐক্য ও ঐক্যমতের জন্যই করেছেন, শরিয়তে যার অনেক গুরুত্ব রয়েছে।’
ঐতিহাসিকগণ মূলত এই কারণটিকেই সবিশেষ উল্লেখ করে থাকেন। মুয়াবিয়ার রাঃ দেখতে পারছিলেন যে তার সরকার বনো উমাইয়া এবং শামবাসী শক্তির উপরই বেশি নির্ভরশীল। সুতরাং যদি তিনি পরিবারের বাইরের কোনো যোগ্য এবং উত্তম ব্যক্তিকে শাসনভারের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেন, তাহলে এরা গোত্রীয় জাতীয়তাবাদ এবং গৃহযুদ্ধের ফেতনায় জড়িয়ে পড়বে। পরবর্তীতে তার এই আশঙ্কা পুরোপুরি সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যখন খলিফা হন, তখন উম্মতের সবাই তার হাতে বাইয়াত নিলেও উমাইয়া আমিরগণ তাকে মেনে নেয়নি। তারা আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। অবশেষে দীর্ঘ নয় বছরের রক্তপাতের পর তারা অসংখ্য শ্রেষ্টত্বের অধিকারী এই মহান সাহাবীকে শহীদ করে এবং নিজেদের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষ্যান্ত হয়।
হাফেজ ইবনে কাসীর রহ. লিখেছেন—
‘মুআবিয়া রা.-এর এই অভিমত ছিল যে, ইয়াযিদ খিলাফাতের যোগ্য। পুত্রের প্রতি পিতার তীব্র স্বভাবগত ভালোবাসার পাশাপাশি ইয়াযিদের জাগতিক ভদ্রতা, তার মধ্যে শাহজাদাসুলভ বৈশিষ্ট্যাবলি, সামরিক বিষয়াবলি সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা, সরকারি প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালনার যোগ্যতা এবং এগুলোর দায়িত্ব পালনের উপযুক্ততার কারণে তিনি এ অভিমত পোষণ করেছেন। ... আর তার ধারণা ছিল, সাহাবায়ে কিরামের সন্তানদের মধ্যে কেউ এমন সুচারুরূপে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন সামলাতে পারবে না।’

ইয়াজিদের মনোনয়ন এবং ওলামায়ে কেরামের অভিমত

কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবি রহ. বলেছেন-

‘নিঃসন্দেহে উত্তম হতো, যদি মুআবিয়া রা. এ বিষয়টিকে শুরার ওপর ন্যস্ত করে দিতেন। আর নিজের কোনো আত্মীয়কেও এ জন্য নিযুক্ত না করতেন, চাই সে পুত্রই হোক না কেন কিন্তু তিনি উত্তম পন্থাকে পরিত্যাগ করেছেন।’

মুফতী তাকী উসমানী সাহেব জুমহুরের অবস্থানের দলিল উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেন-

‘মুআবিয়া রা. তো নিঃসন্দেহে স্বীয় পুত্রকে সদুদ্দেশ্য নিয়ে খিলাফাতের যোগ্য ভেবে পরবর্তী খলিফারূপে মনোনয়ন দান করেছিলেন; কিন্তু তার কর্ম এমন এক দৃষ্টান্ত হয়ে গেছে, যার দ্বারা পরবর্তী সময়ে লোকেরা বেশ মারাত্মকরূপে অবৈধভাবে ফায়দা হাসিল করেছে। তারা এটাকে ঢাল বানিয়ে খিলাফাতের কাঙ্ক্ষিত শুরার ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। আর মুসলিমদের খিলাফতও রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।’

‘নিঃসন্দেহে মুআবিয়া রা.-এর শাসনামলে ইয়াযিদের অপকর্ম কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত নয়। এ জন্য তাকে খিলাফাতের যোগ্য তো ভাবা যেতে পারে, কিন্তু উম্মতের মাঝে এমন ব্যক্তিদের কমতি ছিল না, যারা সততা ও তাকওয়াই শুধু নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক দক্ষতার বিচারেও ইয়াযিদের বিপরীতে অনেক উঁচু স্তরের অধিকারী ছিলেন। যদি খিলাফাতের দায়িত্ব তাদের অর্পণ করা হতো, তাহলে নিঃসন্দেহে তারা এর চেয়ে আরও উত্তমভাবে যোগ্য প্রমাণিত হতেন। এটা ঠিক যে, সর্বোত্তমের উপস্থিতিতে অনুত্তমকে খলিফা বানানো শরয়িভাবে জায়েজ আছে (তার মধ্যে খিলাফাতের গুণাবলি বিদ্যমান থাকার শর্তে), কিন্তু উত্তম হচ্ছে, খলিফা এমন ব্যক্তিকে বানাতে হবে, যিনি সকল উম্মতের মাঝে এই পদের সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত।

‘সদুদ্দেশ্য নিয়ে পুত্রকে পরবর্তী খলিফারূপে মনোনয়ন দান করা শরয়িভাবে তো জায়েজ আছে, কিন্তু অপরদিকে অপবাদের সুযোগ সৃষ্টির কারণে এর থেকে দূরে থাকাটাই উত্তম। আর মারাত্মক প্রয়োজন ব্যতিরেকে এমনটি করা নিজেকে নিজে কঠিন পরীক্ষায় ফেলে দেওয়ার নামান্তর। এ জন্য সকল খলিফায়ে রাশিদা এর থেকে দূরে থেকেছেন।’

ইয়াজিদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা

খিলাফাতের শর্তাবলি অনুযায়ী ইয়াজিদের প্রজ্ঞা, বয়ঃপ্রাপ্ততা, ইসলাম, সুস্থতা ও কুরাইশ বংশ—এসব বিষয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। তিনি জিহাদি অভিযানের নেতৃত্ব ও হজ্জের আমীর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা তার নেতৃত্বের যোগ্যতা প্রমাণ করে।
আর মুআবিয়া রা.-এর জীবদ্দশায় ইয়াজিদের মদপান ও অসদাচরণে জড়িত থাকার বর্ণনাগুলো যয়ীফ ও সংশয়যুক্ত।
মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা রহ. এসব অভিযোগ একেবারেই বিশ্বাস করতেন না। কেননা, তিনি শামে গিয়ে ইয়াযিদের সাথে যখন সাক্ষাৎ করেন, তখন ইয়াযিদের মধ্যে এমন কোনো আপত্তিজনক বিষয় দেখতে পাননি। একবার আবদুল্লাহ ইবনু মুতি রা. তাকে বলেন, ‘ইয়াযিদ মদপান করেন, নামাজ তরক করেন।’ তখন মুহাম্মাদ ইবনু হানাফিয়্যা রহ. জবাবে বলেন, ‘আমি তার কাছে ছিলাম। আপনি যা বলছেন, আমি তার মধ্যে এসব কিছু দেখি নি। আমি তাকে নামাজের অনুসারী, সৎকাজের অন্বেষী ও শরয়ী মাসায়েল উদঘাটনে আগ্রহী পেয়েছি।’

তবে তার মাঝে দূরদর্শিতার অভাব, তাড়াহুড়াপ্রিয়তা, ও অস্থির মানসিকতার ছাপ ছিল যা খলিফা হওয়ার পর কিছুটা তার অভ্যাসে রূপ নেয়। বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি কখনো কখনো সতর্ক সীমার বাইরে চলে যেতেন। আমর ইবনু হাযম রহ., আহনাফ ইবনু কাইস রহ. ও জিয়াদ ইবনু আবি সুফইয়ানের মতো মুআবিয়া রা.-এর নিকটজনরা ইয়াজিদের মনোনয়নে ব্যক্তিগতভাবে একমত ছিলেন না সম্ভবত এই ঘাটতির কারণেই। মদীনার প্রবীণদের আপত্তি ছিল ভিন্ন কারণে—শুরা পদ্ধতির বদলে রাজতন্ত্রে রূপান্তর নিয়ে।
ইয়াজিদের এইসব দুর্বলতা মুআবিয়া রা.-এর অজানা ছিল না, তবে তিনি আশা করেছিলেন দায়িত্ব পাওয়ার পর যোগ্য আমির-উপদেষ্টাদের সহায়তায় ও নিজের উপদেশের আলোকে ইয়াজিদ এসব ত্রুটি কাটিয়ে সফল শাসক হয়ে উঠবেন।

ইয়াজিদের প্রতি মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু এর অসিয়তনামা

মুআবিয়া রা. পরবর্তী উম্মতের জন্য বেশ চিন্তা করতেন। তিনি চেয়েছিলেন, ইয়াযিদ মুসলিম উম্মাহর জন্য এক আদর্শ শাসক প্রমাণিত হবেন। উম্মত তার ওপর ঐকমত্য থাকবে। চতুর্দিকে শান্তি ও নিরাপত্তা বিরাজ করবে। কারও ওপর কেউ নির্যাতন করবে না, কারও অধিকারও হরণ হবে না। যেহেতু এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি দায় ইয়াযিদের ওপরই আরোপিত হবে, এ জন্য মুআবিয়া রা. তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অসিয়ত করেন, যার প্রতিটি বাক্য সোনার হরফে লিখে রাখার মতো। এ অসিয়তগুলো তার পরিণামদর্শিতা ও সর্তকতা, চিন্তা ও দর্শনের গভীরতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং উম্মতের কল্যাণকামনার শ্রেষ্ঠ দলিল।

মুআবিয়া রা. ইয়াযিদকে বলেন—

- আল্লাহকে ভয় করবে। আমি তোমার জন্য খিলাফাতের এ পদটি চূড়ান্ত করে দিয়েছি। তোমাকে এর দায়িত্বশীল বানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

- যদি উত্তমের সাথে থাকো, তাহলে সেটা আমার সৌভাগ্য হবে। আর যদি এমনটা না করো, তাহলে সেটা হবে তোমার দুর্ভাগ্য।

- মানুষের সাথে কোমল আচরণ করবে।

- তোমার কাছে তোমার সম্বন্ধে যে সব হীনকর ও আপত্তিজনক কথা পৌঁছবে, সেগুলো উপেক্ষা করবে।

- সম্ভ্রান্তদের সাথে কঠোর আচরণ করবে না। তাদের সম্মানহানি থেকে বেঁচে থাকবে। তাদের নিজের কাছে রাখবে।

- যখনই কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সম্মুখীন হবে, তখনই প্রবীণ, অভিজ্ঞ, সৎ ও পরহেজগার ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করবে। তাদের অভিমতের বিরোধিতা করবে না।

- নিজের মতের ওপর কখনো চাপ প্রয়োগ করবে না। কেননা, শুধু এক মানসিকতা থেকে আসা অভিমত সঠিক হয় না।

- নিজের আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যবস্থা করবে। মানুষেরাও তোমার সাথে সঠিকভাবে চলবে।

- মানুষকে কখনো কোনো আপত্তির সুযোগ দেবে না। কেননা, মানুষ মন্দ কথা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।

- নিয়মিত জামাআতের সাথে নামাজ আদায় করতে থাকবে।

> যদি এই উপদেশগুলো মেনে চলো, তাহলে মানুষ তাদের ওপর তোমার অধিকার অনুধাবন করবে। আর তোমার সরকার শক্তিশালী থাকবে।”

কারবালা ট্রাজেডি এবং ইয়াজিদ

মাত্র তিন বছরের শাসনকালে যে কয়টি রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে ইয়াজীদ ইতিহাসে সমালোচিত হয়েছেন— তন্মধ্যে কারবালার ঘটনা অন্যতম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদরের নাতি হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কুফা থেকে দামেস্কগামী প্রধান সড়ক কারবালায় অত্যন্ত নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। যদিও এই দুঃখজনক ঘটনার দায় একক ভাবে কারোর মাথায় বর্তায় না। ঐতিহাসিকভাবে কারবালার ট্রাজেডির নেপথ্য গণ্য করা হয় কয়েক শ্রেণিকে—

এক. কুফাবাসী। যারা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হাজার পত্র এবং অঙ্গীকার দিয়ে ডেকে আনে এবং প্রতারণা করে একা ছেড়ে দেয়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সাহাবায়ে কেরাম এবং উম্মতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া পাঠ করলে জানা যায় যে তাদের বেশিরভাগ ক্ষোভই ছিল কুফাবাসীর ওপর।
উম্মু সালামা রা. যখন হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের খবর পেলেন, তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহ আপনি তাদের ধ্বংস করুন। যারা হুসাইন রা.-কে ধোঁকা দিয়েছে। তাদের ওপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক।
যুদ্ধের সময় হুসাইন রা.-এর এ বাক্যগুলো অনুধাবনীয়— ‘হে আল্লাহ, তুমিই আমাদের ও তাদের ন্যায়বিচার করো। তারা আমাকে ডেকেছে যে, আমাদের সহযোগিতা করবে। এখন তারা আমাদের হত্যা করছে।’

দুই. শিয়াগোষ্ঠী। কারবালা ঘটনার পেছনে ঐতিহাসিকভাবে কিছু নামকরা শিয়ার সক্রিয়তার প্রমাণ পাওয়া যায় ধেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো—
এক. আমর ইবনে হাজ্জাজ
দুই. শীমার বিন জিল
তিন. আব্দুল্লাহ জুহাইর ইবনে সালিম
চার. কায়েস বিন আশআস
পাঁচ. সিনান ইবনে আনাস
ছয়. খাওলী ইবনে ইয়াজিদ ।

হুসাইন রা.-কে কেন জীবিতাবস্থায় বন্দি করে কুফায় নিয়ে যাওয়া হলো না, সেই প্রশ্নটিও থেকে যায়। আহত করে বেঁধে হলেও তো তাকে ও তার সঙ্গীদের জীবিত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। তাহলে তাকে হত্যা করে তারা কী লাভ করল?
গভীরভাবে ভাবলে একটি সম্ভাব্য কারণ বোঝা যায়—তাদের আশঙ্কা ছিল, হুসাইন রা. জীবিত থাকলে তাদের গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে। কুফাবাসীদের লেখা সেই পত্রাবলিও তখন হুসাইন রা.-এর হাতে ছিল। এই পত্রগুলো যদি উবাইদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ বা ইয়াজিদ পর্যন্ত পৌঁছে যেত, তাহলে পত্র-লেখকদের বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ত—তাদের ভয়াবহ শাস্তির মুখে পড়তে হতো। সম্ভবত এই কারণেই লুটতরাজের ছদ্মাবরণে ওই পত্রাবলি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। কেননা ইতিহাসে এমন কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না যে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এই পত্রগুলো কোথাও প্রকাশ পেয়েছে বা তার ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এভাবেই হুসাইন রা.-কে আমন্ত্রণ জানিয়ে প্রতারণা করা ব্যক্তিরা কোনো প্রমাণের আওতায় না এসে স্পষ্টভাবে বেঁচে যায়, আর মহান এক উদ্দেশ্য নিয়ে আগত হুসাইন ইবনু আলি রা. তাঁর পরিবারসহ শহিদ হয়ে যান।

তিন ও চার. কারবালা ট্রাজেডিতে উমার ইবনু সাদ ও উবাইদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ উভয়ের ভূমিকাই ছিল উল্লেখযোগ্য। উমার ইবনু সাদ শুরুতে হুসাইন রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযানে অনিচ্ছুক থাকলেও ইবনু জিয়াদের হুমকি ও রেই’র গভর্নরপদের লোভে রাজি হয়। সে প্রথমে লড়াই এড়িয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেছিল এবং ইবনু জিয়াদকেও রাজি করিয়েছিল, কিন্তু শিমারের হস্তক্ষেপে তা ভেস্তে যায়। হুসাইন রা.-এর হত্যায় সে মনে মনে কষ্ট পেলেও অভিযানের নেতৃত্বে থাকায় তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলা যায় না।
অন্যদিকে উবাইদুল্লাহ ইবনু জিয়াদ কোনো দ্বিধা ছাড়াই হুসাইন রা.-কে বিদ্রোহী সাব্যস্ত করে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং তার কর্তিত মস্তক দেখেও কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেনি—এ ঘটনার প্রকৃত দায়ী তাকেই ধরা হয়েছে। আমি একটা প্রশ্ন থেকে যায়– ইয়াজিদের অনুমোদন ছাড়া এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস তাদের কীভাবে হলো? বিশ্লেষণে উঠে আসে, নরম স্বভাবের নুমান ইবনু বাশিরের বদলে কঠোর ইবনু জিয়াদকে কুফার দায়িত্ব দেওয়া থেকেই সে বুঝে নিয়েছিল যে ইয়াজিদ কঠোরতাই চান, তাই পদোন্নতির আশায় সে এই কঠোর পদক্ষেপ নেয়। যদিও পরবর্তীতে তাকে কোনো শাস্তি বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয়নি, তবে ইয়াজিদ প্রকাশ্যে খুশি হননি—বরং বলেছিলেন, “ইবনু জিয়াদ হুসাইন রা.-এর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করে ফেলেছে। তাকে হত্যা করেছে। আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন।”

কারবালার ঘটনা এবং ইয়াজিদের দায়

লোকমুখে প্রসিদ্ধ এবং শিয়াদের প্রভাবে সাধারণত সবাই এটাই মনে করে যে হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং এবং তার পরিবারকে ইয়াজীদ হত্যা করিয়েছিলেন। তবে ঐতিহাসিকভাবে এর কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। প্রমাণিত শুধু এতটুকুই যে বসরা ও কুফার গভর্নর উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ এই নির্মম হত্যাযজ্ঞের কলকাঠি নেড়েছে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া লিখেছেন, ‘ইতিহাসবিদগণ একমত যে ইয়াজীদ হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যার নির্দেশ দেননি।’
হাফেজ ইবনু সালাহ বলেন– ‘আমাদের নিকট একথা বিশুদ্ধ নয় যে ইয়াজিদ হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু কে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। প্রমাণিত এতোটুকু যে সাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথে যুদ্ধের নির্দেশ যা হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের কারণে পরিণত হয় ইরাকের গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ দিয়েছিলেন।’
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইয়াজিদকে কারবালার ঘটনার ব্যাপারে পরিপূর্ণ নির্দোষ দায়মুক্ত ও সংযুক্তহীন ভাবা হবে। কারণ একজন শাসক কে দেশের মধ্যে সংঘটিত প্রতিটি ভালো-মন্দ কাজের দায়িত্বশীল ভাবা হয়। তাই শাসক হিসেবে রাষ্ট্রের সকল ঘটনার দায় ইয়াজিদের ওপরও বর্তায়। সুতরাং কারবালার ঘটনায় মুসলমানগণ তার যে সমালোচনা এবং নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন তা কিছুটা হলেও যথার্থ ছিল। বিশেষত এজন্য যে, কারবালা-উত্তরে ইয়াজিদ শুধু মৌখিক দুঃখপ্রকাশ ও উবাইদুল্লাহ ইবনু জিয়াদকে নিন্দা করা ছাড়া আর কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। ইবনু জিয়াদকে সরকারি অভিযান পরিচালনাকারী বলে ছাড় দেওয়া হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—বিদ্রোহ দমনে শরিয়তসম্মত বিধিবিধান মানা হয়েছিল কি না, বিশেষত যেখানে হুসাইন রা. নিজেই সমঝোতায় রাজি ছিলেন এবং উমাইয়া কর্মকর্তা হুর ইবনু ইয়াজিদ পর্যন্ত এই আচরণের প্রতিবাদ করেছিলেন।
কারবালার ঘটনা ছিল সুস্পষ্ট জুলুম, শরিয়তে যার কোনো অবকাশ নেই। এই অন্যায়ে জড়িত ব্যক্তিকে অন্তত বরখাস্ত করলেও মানুষ কিছুটা সান্ত্বনা পেত, কিন্তু ইয়াজিদ তাও করেননি। এই নিষ্ক্রিয়তা মানুষের কাছে তার সম্মতির ইঙ্গিত হিসেবে প্রতীয়মান হয়, যার ফলে বনু উমাইয়্যার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে এবং ইয়াজিদকে এই ভুলের দুর্নাম আজীবন বহন করতে হয়।

দ্বিতীয় রাজনৈতিক সংকট: হাররার যুদ্ধ

ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার রাজ্যাভিষেকের সময় থেকেই হিজাযের কিছু মান্য ব্যক্তিবর্গ তার খেলাফতের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন না। কারণ তাদের মতে ইয়াজিদের ক্ষমতা লাভ ইসলামের স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতিতে হয়নি। বরং এতে রোম পারস্যের পরিবারতন্ত্রের সদৃশ্যতা ছিল। এই হাতেগোনা ব্যক্তিবর্গ বাদে বাকি সবাই ইয়াজিদের হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ফলতঃ তার শাসন ক্ষমতার ব্যাপারে পুরো উম্মতের ঐকমত্য সংঘটিত হয়। আর এদিকে মক্কা মদীনার মান্যবর কিছু ব্যক্তিবর্গ কিছুতেই ইয়াজিদের হাতে বায়আত হতে রাজি ছিলেন না। মূলত এরই ধারাবাহিকতায় একে একে কারবালা অতঃপর হাররার মতো দুঃখজনক ঘটনা সামনে আসে।

হাররার যুদ্ধের নেপথ্য কাহিনী হলো— মদীনার কিছু প্রবীণ এবং শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ সিদ্ধান্ত নিলেন যে তারা এই সরকারকে ভেঙে দিয়ে খেলাফতের রাশেদার আদলে আনসার ও মহাজিরদের সন্তুষ্টি নিয়ে শুরাভিত্তিক একটি সরকার গঠন করবেন। সে লক্ষ্যে তারা মদীনাতে একটি নাগরিক সরকার গঠন করেন। এবং মদীনা থেকে ইয়াজিদের গভর্নর উসমান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু সুফিয়ান ও বনু উমাইয়ার অপর ব্যক্তিদের বের করে দেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এর মতো অপর মদীনা বাসীর মধ্যে স্থানীয় প্রবীণ সাহাবীগণ এই আন্দোলনকে ফলপ্রসূ মনে করেননি। তায়েফে বসবাসরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসও এই‌ আন্দোলনে একমত ছিলেন না।

যাইহোক, ইয়াজিদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছানোর পর এবারও তিনি পূর্বের ন্যায় অসহিষ্ণু এবং ধৈর্যহীনতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেন। রাসুলের শহরের সম্মান এবং সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীদের মান-মর্যাদার প্রতি লক্ষ্য রেখে নমনীয়তা ও কৌশলে আন্দোলন প্রতিহত করার পরিবর্তে তিনি কঠোরতার পথ বেছে নেন। পাষাণ হৃদয়ের অধিকারী মুসলিম ইবনে উকবাকে সেনাপতি বানিয়ে বারো হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর পাঠান মদীনা আক্রমণ করার জন্য। সাথে দলপতি কে এ মর্মে নির্দেশ দেন যে, ‘তিনদিন পর্যন্ত মদীনা বাসিকে আনুগত্যের আহ্বান করবে। এরপরও তারা না মানলে লড়াই করবে। যদি তুমি জয়ী হও তাহলে তিনদিন পর্যন্ত শহরে লুটতরাজ চালাবে। পয়সা কড়ি সাধারণ ব্যবহার্য সামগ্রী অস্ত্র ও বাসনকোসন বাহিনীর হয়ে যাবে। আলী ইবনে হুসাইন যাইনুল আবিদীনের প্রতি খেয়াল রাখবে। এই বিদ্রোহের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই।’ (তারীখুল ইসলাম)
২৭ জিলহজ ৬৩ হিজরীতে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে এই দুঃখজনক ঘটনার ইতি ঘটে।
এই যুদ্ধে প্রায় ৭০০ জন কুরআনের হাফেজ কারী শহীদ হন। এছাড়াও অসংখ্য প্রসিদ্ধ সাহাবী তাবেয়ী শাহাদাত বরণ করেন। লুটতরাজের ফলে পুরো শহর বিরান হয়ে পড়ে। মসজিদে নববীতে প্রায় তিন দিন আজান এবং নামাজ আদায় হয়নি।

তৃতীয় রাজনৈতিক সংকট: মক্কা আক্রমণ

ইয়াজিদ খেলাফতের আসনে অতিষ্ঠ হবার পর হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরকে জোরপূর্বক বাইয়াতে বাধ্য করলে একজন কুফার পথে অপরজন মক্কায় চলে যান। এযাবৎকালে ইবনে জোবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কাতেই ছিলেন। সেখানে তিনি খেলাফত পুনঃসংস্কারের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যান। তাকে কেন্দ্র করে সেখানেও ইয়াজিদ বিরোধী আন্দোলন সুসংগঠিত হতে থাকে। হাররার যুদ্ধের তিনদিন পর মুসলিম ইবনু উকবা বিশাল সৈন্যবহর নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা দেয়। তবে সে অসুস্থ ছিল। পথে রোগের তীব্রতা বেশ বেড়ে যায়। বাঁচার আশা ক্ষীণ হয়ে যায়। ৭-ই মুহাররম সে আবওয়ার সন্নিকটে মারা যায়। মৃত্যুর আগে সে ইয়াযিদের নির্দেশনা অনুযায়ী হুসাইন ইবনু নুমাইরকে ডেকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে বাহিনীর আমির নিযুক্ত করে দিয়েছিল। তাকে কঠোরতার সাথে বলেছিল, “কুরাইশদের থেকে সতর্ক থাকবে। তাদের সাথে মুনাফেকির আচরণ করবে। মক্কা পৌঁছে মোর্চা বানাবে, আক্রমণ করবে এবং ফিরে যাবে। কোনো কুরাইশীর পরামর্শে কান দেবে না।” তার আশঙ্কা ছিল, কুরাইশ নেতারা তার উপর প্রভাব বিস্তার করে যুদ্ধে বাধা না দেয়। হুসাইন ইবনু নুমাইর ২৬ মুহাররম, ৬৪ হিজরি শামী সৈন্যদের নিয়ে মক্কা পৌঁছে । এদিকে মক্কাবাসীও নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কয়েক দিন পর্যন্ত নিষ্ফল আলোচনার পর ১৩ সফর, ৬৪ হিজরি, রবিবার লড়াই শুরু হয়ে গেল।
এই যুদ্ধেও অনেক মুসলমান হতাহত এবং নিহত হন। এমনকি যুদ্ধের এক পর্যায়ে পবিত্র বায়তুল্লাহ শরীফে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ১৪-ই রবিউল আউয়াল ৬৪ হিজরি ৩৮ বছর বয়সে তিন বছর সাত মাস বাইশ দিনের সংক্ষিপ্ত শাসনকার্য পরিচালনা করে হাওয়ারিনে অবস্থানকালে ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়া পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তার পুত্র মুয়াবিয়া ইবনে ইয়াযিদ জানাযা পড়ান।
ইয়াজিদের শাসনকালে রাষ্ট্রীয় বিজয়াভিযান ও উন্নয়ন
ইউরোপ ফ্রন্ট: পশ্চাদপসরণ
মুআবিয়া রা.-এর অসিয়ত সত্ত্বেও ইয়াজিদ রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান শিথিল করেন। ফলে রোডস ও সাইপ্রাস দ্বীপ থেকে মুসলিম বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়, যা আগে বিজিত হয়েছিল। ঐতিহাসিকগণ এর সঠিক কারণ বলেননি, তবে সম্ভাব্য কারণ ছিল—অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে সৈন্যের প্রয়োজন এবং সেনাবাহিনীর মন জয় করার ইচ্ছা।

আফ্রিকায় উকবা ইবনু নাফি রহ.-এর বিজয়াভিযান
প্রথমে আবু মুহাজির রহ.-এর কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরিত হওয়ায় উকবা রহ. ফিরে এসেছিলেন। ইয়াজিদ ৬২ হিজরিতে তাকে পুনরায় আফ্রিকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। উকবা রহ. কায়রাওয়ান পুনর্গঠন করেন, এরপর একের পর এক অঞ্চল জয় করতে করতে মরক্কোর তানজাহ (Tangier) পর্যন্ত পৌঁছান। অবশেষে আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে পৌঁছে বিখ্যাত দুআ করেন—”আয় আল্লাহ, যদি এই সমুদ্র বাধা না হতো, যতদূর ভূমি পেতাম, জিহাদ করতে করতে এগিয়ে যেতাম। আয় আল্লাহ, তুমি জানো, আমরা কোনো অহংকার ও ঔদ্ধত্যের ভিত্তিতে এই পর্যন্ত আসিনি। আমরা শুধু সেই লক্ষ্যের জন্য বেরিয়েছি, যা তোমার বান্দা জুলকারনাইনের উদ্দেশ্য ছিল, অর্থাৎ শুধু তোমার ইবাদত করা হবে। তোমার সাথে কাউকে শরিক করা যাবে না। আয় আল্লাহ, আমরা কুফর বিরোধী এবং ইসলামের রক্ষক। সুতরাং তুমি আমাদের সহায়ক হও। আমাদের বিরোধী হয়ো না।”

খোরাসান ও মধ্য এশিয়া

এই ফ্রন্টে রুটিন অনুযায়ী গ্রীষ্মকালীন অভিযান ও শীতকালীন প্রত্যাবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকে, যদিও খাওয়ারিজমে স্থানীয় ষড়যন্ত্রের কথাও উল্লেখ আছে।
নির্মাণকাজ
এসবের মাঝে ইয়াজিদ দামেস্কে একটি সেচনালা প্রশস্ত করেন, যা ‘নাহরে ইয়াজিদ’ নামে পরিচিত এবং ‘গোতা’ এলাকাকে কৃষিযোগ্য করে তোলে।

ইয়াজিদের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের মন্তব্য

হাফেজ যাহাবী রহ. লিখেছেন—’ইয়াযিদ তাদের অন্যতম, যাদের আমরা না ভালো-মন্দ বলি, না তাদের ভালোবাসি।’

শাফেয়ী মাজহাবের বিখ্যাত ইমাম শায়খ ইবনুল হাদ্দাদ রহ. বলেন, ‘আমরা মুআবিয়া রা.-এর জন্য রহমতের দুআ করি এবং ইয়াযিদের অভ্যন্তরীণ বিষয় আল্লাহ তাআলার ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।’
আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. লিখেছেন, '
‘ইয়াযিদ নিঃসন্দেহে ফাসিক ছিলেন।’

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. এক ফতওয়ার আবেদনের জবাবে লিখেছেন, ‘ইয়াযিদ ফাসিক ছিলেন। আর ফাসেকের ক্ষমতালাভ তথা সরকার গঠন মতবিরোধপূর্ণ বিষয়।’

আল্লামা সাইয়িদ মুহাম্মাদ ইউসুফ বানুরি রহ. লিখেছেন, ‘ইয়াযিদের ফাসিক হওয়ার মধ্যে কোনো সন্দেহ নেই।’

শাইখুল হাদীস মাওলানা সলিমুল্লাহ খান রহ. ইয়াযিদের চরিত্র সম্পর্কে বলেন, ‘আমি ইয়াযিদের ফাসিক হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহের শিকার নই। ইয়াযিদের পাপাচারের মৌলিক কারণ তার শাসনকালের এ তিন ঘটনা …’

এরপর শায়খুল হাদীস রহ. কারবালার ঘটনার অপরাধীদের দণ্ড প্রদান না করা, হাররায় সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিয়িদের হত্যা এবং এরপর মক্কা মুকাররমায় ইয়াযিদের সেনা অভিযানের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন। এরপর এ সন্দেহের বেশ পরিপূর্ণ ও গবেষণামূলক জবাব দিয়েছেন যে, ইয়াযিদের দুশ্চরিত্র সংক্রান্ত সকল বর্ণনা তো শিয়াদের বানানো ও ছড়ানো। শায়খুল হাদীস রহ. লিখেছেন— ‘যতদূর পর্যন্ত শিয়া সম্প্রদায়ের বানোয়াট ও অপবাদ আরোপের সম্পর্ক রয়েছে, তাতে প্রথম তিন খলিফা, মুআবিয়া রা. এবং উম্মাহাতুল মুমিনিনের মধ্যে আয়েশা রা. ও হাফসা রা. পর্যন্ত কেউ বাদ যাননি। রাফেজীরা যখন এই সব শীর্ষস্থানীয় সাহাবির বিরুদ্ধে এক লম্বা কল্পকাহিনী রচনা করেছে, তখন এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, এই সম্প্রদায় ইয়াযিদ সম্পর্কে কত কিছুই না কল্পকাহিনী ও প্রহসন রচনা করে থাকবে। তথাপি উল্লিখিত তিনটি ঘটনা ঐতিহাসিক ধারবাহিকতায় পরম্পরা তথা মুতাওয়াতির পর্যায়ভুক্ত। আর আহলে সুন্নাতের মনীষীরা এর ওপর আস্থা রেখেছেন। আহলে সুন্নাতের পরিমণ্ডলে সাহাবায়ে কিরামের পাশাপাশি পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের মর্যাদা ও গুণাবলি উদ্দীপনা ও ঈমানী আবেগের সাথে বর্ণনা করা উচিত। আর যারা ইয়াযিদের প্রশংসা ও গুণকীর্তন করবে, তাদের পথ রোধ করা উচিত।’

পরিশেষে, ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার ব্যক্তি ও শাসক জীবন সম্পর্কে ছোট্ট করে বললে বলা যায়– ব্যক্তি জীবনে তার নৈতিক কিংবা ধর্মীয় স্থলনের বিষয়ে ইতিহাসে সুস্পষ্ট কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না বিধায় এক্ষেত্রে তার সম্মানকে খাটো করার সুযোগ নেই। তবে শাসক জীবনে তার একাধিক রাজনৈতিক ও দূরদর্শিতা এবং অপরিণামর্শী সিদ্ধান্তের কারণে ইতিহাসে তিনি সমালোচিত হয়ে থাকবেন।

📑 টীকা ও তথ্যসূত্র

  1. লেখা সহায়তায়: তারীখে উম্মাতে মুসলিমাহ
ট্যাগ: #পাঠালাপ। ইতিহাস। ইয়াযিদ
📤 লেখাটি শেয়ার করুন:
Facebook WhatsApp
পাঠক প্রতিক্রিয়া: 👁️ -- পঠিত