ড. ফাতহুল্লাহ জিয়াদি ইসতিশরাক বা প্রাচ্যবিদ্যার একাধিক সংজ্ঞা তুলে ধরেছেন। ব্যাপক অর্থে প্রাচ্যবিদ্যা হলো– প্রাচ্যের যে কোনো ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে পশ্চিমা গবেষণা। আর বিশেষ অর্থে ইসতিশরাক বলা হয়– ইসলামী প্রাচ্য, তার ভাষা, ইতিহাস ও আকিদা নিয়ে পশ্চিমা গবেষকদের কাজ। সব সংজ্ঞাতেই দুটি দিক আছে, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য। অধিকাংশের মতে প্রাচ্যবিদ্যা একই সঙ্গে জ্ঞানতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যাপার, কারণ প্রাচ্যকে জানার মধ্য দিয়েই প্রাচ্য দেশীয় অঞ্চলে পশ্চিমের আধিপত্য ও উপনিবেশের পথ তৈরি হয়েছে। এই ধারণা উনিশ শতক-পরবর্তী বিশ্ব-রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত।
আরবি শব্দকাঠামোয় أ س ت যুক্ত ফেয়েল তলবের অর্থ দেয়, তাই الاستشراق-এর শাব্দিক অর্থ দাঁড়ায়, প্রাচ্যকে কামনা করা। এর মাঝে প্রাচ্য ভ্রমণ, প্রাচ্য নিয়ে গবেষণা ও প্রাচ্যে উপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠা— সবই পড়ে। তবে এটি এখন নিছক শব্দ নয়, একটি পরিভাষা, তাই আভিধানিক ও পারিভাষিক দুই অর্থই আমাদের জানা থাকা দরকার।
প্রাচ্য শব্দটিতে ভৌগোলিক অর্থ অনেকটা আপেক্ষিক। তাই শব্দটিকে আমাদের ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে। ইতিহাসে বিশ্বশক্তি বরাবর প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিবিরে বিভক্ত ছিল, যেমন রোম-পারস্য, রোমান-মুসলিম, মুসলিম-ক্রুসেডার, উসমানী-ইউরোপীয় বিভাজন। বর্তমানে পাশ্চাত্যে ইউরোপ-আমেরিকা এবং প্রাচ্যে এশিয়া-আফ্রিকা। সুতরাং ইসতেশরাক মানে পাশ্চাত্য কর্তৃক প্রাচ্যকে কামনা করা, যেখানে ক্রিয়া বা ফেয়েলের নিসবত তথা সম্পর্ক পাশ্চাত্যের দিকে।
এই সম্পর্কের ধরন নিয়ে দুটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে। অর্থাৎ ঠিক কী অর্থে পশ্চিমারা প্রাচ্যকে কামনা করে এক্ষেত্রে দুইটা নজরিয়া আছে। একাডেমিক দৃষ্টিতে দেখলে বলা হবে, এটি পশ্চিমা পণ্ডিতদের প্রাচ্য-গবেষণা। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে– ইসতিশরাকের মানে হলো জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাচ্যকে আত্মস্থ করে তার ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টার নাম ইসতেশরাক ।
পরিচয়
প্রাচ্যবিদ কারা—এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটা জটিল। সাধারণভাবে ধারণা করা হয়, পাশ্চাত্যের অমুসলিম পণ্ডিতরাই কেবল প্রাচ্যবিদ। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, যারা পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি ধার করে প্রাচ্যকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন, তাদেরকেও এই কাতারে ফেলা যায়
ফলে বুঝা গেল– প্রাচ্যবাদ কেবল জাতিগত কোনো পরিচয় নয়, বরং এটা একধরনের পদ্ধতিগত অবস্থান।
প্রাচ্যবিদ্যা চর্চার সূচনা ঘটে মধ্যযুগে, যখন মুসলিম-শাসিত আন্দালুসে খ্রিস্টান পাদ্রীরা মাদরাসায় ভর্তি হয়ে আরবি ভাষা ও ইসলামি জ্ঞান আহরণ করা শুরু করে। ফরাসি পাদ্রী জারবার্টও তাদেরই একজন। এবং পরবর্তীতে যিনি রোমের পোপ নির্বাচিত হন। এই পাদ্রীরা স্বদেশে ফিরে আরবি জ্ঞান-বিজ্ঞান ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করতেন এবং নিজ দেশে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে আরবি শিক্ষার প্রসার ঘটাতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের বিস্তারের সাথে সাথে এই ধারা দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করে, যখন প্রাচ্যবিদরা মুসলিম বিশ্বের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করতে থাকেন—কখনো কিনে, কখনো চুরি করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই আরবদের হাতছাড়া হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে চলে যাওয়া পাণ্ডুলিপির সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় আড়াই লাখে। খ্রিস্টানরা স্পেন পুনর্দখলের পর সেখানকার ইসলামী তুরাস এবং বইপত্রের পাণ্ডুলিপির যে করুণ পরিণতি ঘটে, তা আমাদের ইতিহাসের এক দুর্বিষহ অধ্যায়। দুঃখজনক বিষয় হলো, এই দুর্ঘটনায় মুসলিম শাসক এবং সাধারনের নিজস্ব উদাসীনতাও কম দায়ী নয়।
১৮৭৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক মুসতাশরিক কনফারেন্স, যা পরবর্তীতে নিয়মতান্ত্রিক ধারায় পরিণত হয়।
ড. মুস্তফা আস-সিবাঈর গবেষণা অনুযায়ী প্রাচ্যবিদদের তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়—
এক.পাদ্রী শ্রেণি, যাদের মূল পরিচয় ধর্মযাজক এবং যারা নিজেদের গবেষণাকে মিশনারি কাজের অংশ হিসেবে দেখেন।
দুই. সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত প্রাচ্যবিদ, যারা রাষ্ট্রীয় পররাষ্ট্রনীতির সহায়ক হিসেবে কাজ করেন।
তিন. ইহুদি প্রাচ্যবিদ, যাদের মধ্যে অনেকেই ধর্মীয় পক্ষপাত নিয়ে ইসলাম চর্চা করেন।
তবে এই তিন শ্রেণির বাইরেও তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ নিষ্ঠাবান বা সৎ প্রাচ্যবিদের অস্তিত্ব আছে—আদ্রিয়ান রিল্যান্ড, জোহান জ্যাকব রেইস্কে, টমাস আর্নল্ড কিংবা সিলভেস্ট্রে ডি স্যাসির মতো প্রাচ্যবিদদের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। যাঁরা ইসলাম গ্রহণ না করেও তুলনামূলক নিরপেক্ষতার সঙ্গে গবেষণা চালিয়েছেন বলে পরিচিত। এমনকি এমন একদল প্রাচ্যবিদও আছেন, যাঁরা গবেষণার সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণও করেছেন—মুহাম্মদ আসাদ, রেনে গেনোঁ, মুরাদ হফম্যান, আবদুল করিম জারমানুস কিংবা মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকথলের মতো ব্যক্তিত্বরা এর প্রমাণ। তবে এক্ষেত্রে এটা মনে রাখাও জরুরি–কেউ ইসলাম গ্রহণ করা মানেই তাঁর প্রতিটি লেখা বা মতামত নির্ভরযোগ্য, এমনটা নয়।
প্রাচ্যবিদদের চিন্তা ও তার উৎস
প্রাচ্যবিদদের চিন্তাধারা গড়ে উঠেছে মূলত পাঁচটি কারণের সমন্বয়ে—
এক. ধর্মীয় চেতনা— এটা সবচেয়ে বড় ও প্রথম কারণ। খ্রিস্টান পাদ্রীরা বিশ্বাস করেন, ইসলামই খ্রিস্টধর্মের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, আর তাই ইসলামের সৌন্দর্যের ওপর কালিমা লেপন করা তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব। মধ্যযুগে খ্রিষ্ট বিশ্বের কাছে ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব একধরনের আতঙ্কের জন্ম দেয়, এবং তা মোকাবিলার জন্যই ইসলাম ও তার নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিকৃতভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস শুরু হয়। আধুনিক বিজ্ঞান যখন খ্রিস্টধর্মের ভিত্তি নড়বড়ে করে দিতে থাকে, তখন পাদ্রীরা জনগণের দৃষ্টি ঘোরাতে এবং জল ঘোলা করতে ইসলামের ওপর আক্রমণকে নতুন কৌশল হিসেবে বেছে নেন।
দুই. সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা। ক্রুসেড যুদ্ধে সামরিকভাবে পরাজিত হয়েও পশ্চিমারা মুসলিম বিশ্ব দখলের বাসনা ত্যাগ করেনি। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো যখন প্রাচ্যের মানচিত্র দখলে নামে, তখন সেই ভূখণ্ডের মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতি বোঝার প্রয়োজনীয়তা থেকেই প্রাচ্যবিদ্যাচর্চায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়। কারণ প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার অঅন্যতম সবচেয়ে সহজ উপায় হলো তার সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা।
তিন. বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, সস্তায় কাঁচামাল সংগ্রহ, স্থানীয় শিল্প-কারখানা ধ্বংস করে তাদের নিজস্ব নির্ভরশীলতা তৈরি এবং প্রাচ্যের সম্পদ ও বাণিজ্যপথ নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে প্রাচ্যকে জানার প্রয়োজন দেখা দেয়।
চার. রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষণ। আরব্য দেশগুলোর ইউরোপীয় দূতাবাসগুলোতে সাধারণত একটি সংস্কৃতি বিভাগ থাকে। যার দায়িত্বে থাকা অফিসাররা স্থানীয় সাংবাদ মাধ্যম ও বুদ্ধিজীবী মহলের সঙ্গে লিঁয়াজো করে ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেয়। উপনিবেশিক জাতিকে কোণঠাসা করে রাখতে তাদের চিন্তাধারা ও ধর্মবিশ্বাসের দুর্বলতা খুঁজে বের করাও এই সংস্কৃতি বিভাগের অংশ।
পাঁচ. বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক কৌতূহল। মুসতাশরিকদের একটি ছোট অংশ নিছক জ্ঞানপিপাসা থেকে প্রাচ্যচর্চায় আসেন। এই শ্রেণির ভুলের পরিমাণ তুলনামূলক কম, কারণ তারা ইচ্ছাকৃত প্রতারণা করেন না।
এই চিন্তাগুলোকে সমন্বয় করলে দেখা যায়, প্রাচ্যবিদদের বাস্তবিক এজেন্ডা মৌলিকভাবে তিন ধরনের— প্রথমত: বুদ্ধিবৃত্তিক সংশয় স্থাপন; অর্থাৎ, নবুওয়াত, কুরআন, হাদীস, ফিকহ ও আরবি ভাষার প্রকৃতি ও ভিত্তিতে সন্দেহ তৈরি করা, দ্বিতীয়ত: ধর্মীয় হীনম্মন্যতা তৈরি ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে জাহেলি জাতীয়তাবাদ উসকে দেওয়া। তৃতীয়ত: অজানাকে জানার নিছক কৌতূহল থেকে প্রাচ্যচর্চা, যা তুলনামূলক নিরাপদ ও সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রাচ্যবিদদের কর্মপদ্ধতি
প্রাচ্যবিদদের কর্মপদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁরা কয়েকটি স্তরে কাজ করেছেন।
প্রথম স্তর: পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ ও নিয়ন্ত্রণ। ইসলামী তুরাস ও জ্ঞানভাণ্ডারের অন্যতম সোর্স তথা হাজার হাজার হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি—ব্রিটিশ, ইতালীয়, ফরাসি ও ডাচ প্রাচ্যবিদরা নানা কৌশলে সংগ্রহ করে নিজ নিজ দেশের গ্রন্থাগারে নিয়ে যান, যার ফলে মুসলিম বিশ্ব জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রবলভাবে ব্যাক সিটে চলে যায়।
দ্বিতীয় স্তর: বইপুস্তক রচনা এবং এর মধ্য দিয়ে ইতিহাস ও সীরাত বিকৃতি। প্রাচ্যবিদরা ইসলামী চিন্তাধারা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও কুরআন সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেন। সেখানে মূল টেক্সট উদ্ধৃত করার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে বিকৃতি ঘটানো হয়েছে। আলফ্রেড গিয়োমের মতো প্রাচ্যবিদ তাঁর আল-ইসলাম গ্রন্থে আসহাবে ফীলের ঘটনার মতো সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে অস্বীকার করেছেন, ইসলামকে ভিন্ন ধর্ম থেকে ধারকৃত মতবাদ বলে অপবাদ দিয়েছেন—যদিও আল্লামা সুহাইলির মতো মুসলিম পণ্ডিতরা এসব দাবির সুনির্দিষ্ট জবাব দিয়েছেন। পি. কে. হিট্টি তাঁর তারিখুল আরব গ্রন্থে মিরাজ, বুরাক, বনু কুরাইযার ঘটনা, হাজরে আসওয়াদ কিংবা হুদাইবিয়ার সন্ধির মতো বিষয়ে বিভ্রান্তিকর বর্ণনা তৈরি করেছেন। ড. মুস্তফা আস-সিবাঈও তাঁর বইতে হিট্টির সমালোচনা করেছেন—বিশেষত ইসলামি সভ্যতার কৃতিত্ব খাটো করে দেখানোর প্রবণতা নিয়ে। তিনি আরও দেখিয়েছেন কীভাবে গোল্ড যেহের দিময়ারীর একটি অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে ইমাম আবু হানীফা সম্পর্কে এবং ইমাম যুহরীকে জাল হাদীস প্রণেতা বলে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছেন। এই ধরনের বিকৃতি কেবল একাডেমিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং শিক্ষাক্ষেত্রে মিশনারি কার্যক্রমের সঙ্গে মিলিত হয়ে সমাজের গভীর পর্যন্ত প্রবেশ করেছে।
তৃতীয় স্তর: ভাষাগত আগ্রাসন। যা প্রাচ্যবিদদের কর্মপদ্ধতির এক সূক্ষ্মতম দিক। প্রমিত বা ফসীহ আরবি ভাষার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয়, যেখানে যুক্তি দেওয়া হয় কথ্য ভাষাই সাধারণ মানুষের প্রকৃত ভাষা, তাই ফসীহ আরবীকে বাতিল করা উচিত। এর পেছনের উদ্দেশ্য ছিল কুরআনের ভাষার সঙ্গে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংযোগ শিথিল করে দেওয়া। উলামা কেরাম অবশ্য এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।
চতুর্থ স্তর: প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ। যা আস-সিবাঈর বইতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব বিষয়ক নিজস্ব পত্র-পত্রিকা প্রকাশ যেমন মার্কিন মিশনারিদের পত্রিকা দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড, গণউন্নয়ন ও সেবার আড়ালে খ্রিস্টান মিশনারি প্রেরণ, মিসর-সিরিয়া-ইরাক-মরক্কো-পাকিস্তান ও ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “ইসলামিক স্টাডিজ” বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে সেখানে প্রাচ্যবিদদের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগের ব্যবস্থা, স্থানীয় জাতীয় পত্রিকায় প্রভাব বিস্তার, ১৭৮৩ সাল থেকে নিয়মিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন, এবং ইসলামিক ইনসাইক্লোপিডিয়ার মতো বিশ্বকোষ প্রকাশ—এই সবকিছুই একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে প্রাচ্যবিদদের চিন্তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম হস্তান্তরিত হয়েছে। ড. মুস্তফা সিবাঈ নিজের ইউরোপ সফরের অভিজ্ঞতায় এই বিষয়টি প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণ করেন—অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, এডিনবরা, গ্লাসগো, ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রধান পদে সাধারণত এমন প্রাচ্যবিদ প্রফেসর নিয়োগ পান যারা হয়তো পাদ্রী কিংবা ইহুদি কিংবা সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাধারা পোষণ করেন। যারা তাদের পূর্বসূরিদের প্রাচ্যবিদদের গবেষণাকেই একমাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস মনে করেন এবং কোনো ছাত্রকে তাদের বিরুদ্ধে তানকীদি গবেষণার অনুমোদন দেন না।
সবমিলিয়ে বলা যায়, প্রাচ্যবিদদের পরিচয় কোনো একরৈখিক সংজ্ঞায় বাঁধা যায় না—তাঁরা কেউ নিরপেক্ষ গবেষক, কেউ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক এজেন্ডাবাহী, আবার কেউ সত্যের সন্ধানে শেষ পর্যন্ত ইসলামের কাছেই আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের চিন্তার মূলে রয়েছে ধর্মীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ, অর্থনৈতিক লোভ, রাজনৈতিক অভিলাষ ও জ্ঞানগত কৌতূহলের এক জটিল মিশ্রণ। আর তাঁদের কর্মপদ্ধতি বিস্তৃত হয়েছে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, ইতিহাস-সীরাত বিকৃতি, ভাষাগত আগ্রাসন এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের মতো বহুমুখী কৌশলে। এই সামগ্রিক চিত্র সম্পর্কে ধারণা লাভ করা আমাদের জন্য একান্ত জরুরি, কেননা প্রাচ্যবাদের প্রভাব কেবল অতীতের একাডেমিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নেই—তা এখন শিক্ষাক্ষেত্র, গণমাধ্যম ও সাধারণ লেখালেখির মধ্য দিয়ে সমাজে সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে।