আমার পড়াশোনার শুরু কাল থেকে এ পর্যন্ত খুব বেশি মাদরাসা বদলানো হয়নি। ফলে আমার প্রিয় শিক্ষক এবং বিদ্যাপীঠ বলতে গেলে আমার পঠিত মাদরাসায় সবগুলোই। তবে যেহেতু প্রিয় শিক্ষাঙ্গন এবং প্রিয় শিক্ষক শিরোনামে কিছু লেখতে বলা হয়েছে সেজন্যেই আলাদা করে বলা আরকি।
শৈশব থেকে একাধারে সাতটি বছর এক প্রতিষ্ঠানে এক সাথীদের সঙ্গে পড়াশোনার ফলে যখন প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে, তখন হৃদয়ের মাঝে কান্নার জোয়ার ভেসে যায়। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো খুব কষ্ট হবে নিজেকে মানিয়ে নিতে। প্রথমবার প্রিয় মাদরাসা, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের মায়া ছেড়ে দূর কোথাও যেতে হবে— ভেবে মনটা হুহু করে উঠেছিল। কিন্তু আমি কি জানতাম– আল্লাহ তাআলা আমার নতুন এই ঠিকানাকেই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে রূপান্তর করবেন। আমি কি জানতাম– একদিন এই প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়েই আমি সবার মাঝে গরব করব। বলে বেড়াবো– এটাই আমার পাঠ-জীবনের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ।
পাঠক, বলছিলাম ঢাকার অদূরে শনির আখড়ায় অবস্থিত স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদের কথা। মাদরাসায় প্রবেশের প্রথমদিন থেকেই মনের ভেতর একটা অন্যরকম অনুভূতি ফিল করছিলাম। যদিও প্রথম দিককার কিছু দিন বিচ্ছেদের মনঃকষ্টে ভুগেছিলাম। কিন্তু ধীরে ধীরে এই কষ্ট গভীর মায়া, ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধায় রূপ নেয়। অজান্তেই অটুট এক বন্ধনে জড়িয়ে যাই এই মাদরাসার সাথে। মাদরাসার ভবন, মাঠ, মসজিদ, আঙ্গিনা— সবকিছুতেই যেন এক আপনত্ব খুঁজে পাই। সাথীদের সঙ্গে গড়ে উঠে এক অভূতপূর্ব সম্পর্ক। জালালাইনের বছর সঙ্গত কারণে আমরা সকলেই ছিলাম মাদরাসায় নতুন। ফলে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের সুখ-দুখ ভাগ করে নিয়েছিলাম সমানভাবে। সবাই সবাইকে সময় দিয়েছি, সবকিছুতে সহযোগিতা করেছি— ফলে অল্প কয়েকদিনের মাঝেই দীর্ঘ দিনের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন তৈরি হয়ে যায় আমাদের মাঝে।
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমার অসীম ভালোবাসার অন্যতম প্রধান কারণ হলেন মাদরাসার শিক্ষকগণ। আমার আজও বুঝে আসে না– কিভাবে তাঁরা আমাদেরকে এতটা আপন করে নিয়েছিলেন। কিভাবে ঔরসজাত সন্তানের মতো আমাদেরকে আগলে রেখেছিলেন। ভাবনার দরিয়ায় তাঁদের কথা ভেবে ভেবে অকূল হয়ে যাই। জুনিয়র থেকে সিনিয়র— মাদরাসার সকল উস্তাদগণই ছিলেন আমাদের প্রতি সমান যত্নবান, স্নেহশীল। ফলে ‘প্রিয় শিক্ষক’ বলে তাঁদের মধ্য থেকে আলাদা করে কাউকে উল্লেখ করে অন্যদেরকে ‘ছোট’ করতে চাই না। তবুও যদি কারুর কথা আলাদাভাবে বলতে হয়, তাহলে বিশেষভাবে আমি আমার পরম প্রিয় দু'জন উস্তাদের কথা বলব— যাঁদের দেখা পেলে, যাদের দরসে না বসলে হয়ত আমার এই জীবন কখনোই পূর্ণতা পেত না। যাঁদের অসীম বরকতময় সোহবত না পেলে আমি হয়তো কখনোই বুঝতাম না যে শিক্ষক কিভাবে এত মহান হয়। আমি আজকে তাঁদের নাম উল্লেখ করব না, কারণ আমি চাই না– তাঁদের প্রতি আমার এই কূলহীন ভালোবাসার ‘ভাগিদার’ অন্য কেউ হোক! আমি চাই, আমার মনের মানুষগুলোর নাম শুধু আমার মনই জানুক। মহব্বতের এই ‘অযৌক্তিক’ দাবিটা আশা করি পাঠক সরলভাবেই গ্রহণ করবেন।
আমার গুরুদ্বয়ের ব্যাপারে আসলে লেখার মতো যোগ্যতা আমার এখনো হয়ে উঠেনি, ভবিষ্যতে হবে বলে মনেও করি না আমি। তারপরও নিখাঁদ ভালোবাসার দাবিতেই আজকের এই দু’কলম লেখা। যাঁদের সান্নিধ্য না পেলে আমার ফিকরি এবং আখলাকি যেসব ভুলভ্রান্তি ছিল সেগুলো হয়তো কখনোই শুধরাতে পারতাম না— তাঁদের তরে দু'লাইন কলম চালানোটা মুগ্ধতার বহিঃপ্রকাশ বৈ কিছু নয়। দুয়া করি রাব্বে কারীম যেন দুনিয়া এবং আখেরাতের সবখানে তাঁদের সান্নিধ্য লাভের তাওফিক দেন। সেই সঙ্গে এই সান্নিধ্যতাকেই আমার পরকালের নাজাতের উসিলা বানান। আমীন। এবং দুআ চাই পাঠকের কাছে, আল্লাহ যেন আমার শিক্ষকগণকে সুস্থতাপূর্ণ নেক হায়াত দান করেন। দুনিয়া এবং আখেরাতে যেন তাঁদের ভাগ্যে ‘হাসানা’ নসীব হয়। আমীন।