✨ GEMINI LIVE
🗓️ --
-- : -- : -- --

আফফান লাবীব

লাবীবের খেরোখাতা · চিন্তা ও পাঠের নিভৃত আঙিনা

ফাঁদ

আফফান লাবীব আফফান লাবীব আফফান লাবীব
আফফান লাবীব তাখাসসুস ফিল আদব ও ইসলামিক স্টাডিজ
· ৮ মিনিটে পাঠ্য · 👁️ --

> সাবের চৌধুরী
বিকেল। আসরের নামাজ শেষে রুমে বসে আছি। এমন সময় দরজার বাইরে থেকে কে যেন সালাম দিল। জবাব দেওয়ার পর ভিতরে যে ঢুকলো তাকে দেখে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। আফফান। ভীতিটা যথাসম্ভব গোপন করে হাসিমুখে বসতে দিলাম। কিন্তু যতই গোপন করি, হাতেনাতে ধরা পড়ার পর চেহারার অপ্রস্তুত ও সন্ত্রস্ত ভাবটা পুরোপুরি গায়েব করে ফেলা কঠিন। এই ভয়ের পেছনে গত দু তিন মাস যাবত চলে আসা একটি নির্লজ্জ পলায়ন ও টালবাহানার ছোট্ট ইতিহাস আছে। আফফান তাদের শামাদানের বিশেষ সংখ্যার জন্য একটি লেখা চেয়েছিল। আমিও অত্যন্ত আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে কথা দিয়েছিলাম—লেখা আমি দিবই দিব। তারপরই এই দুঃখজনক ইতিহাস রচিত হলো। একান্ত ইচ্ছা থাকা সত্তেও শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞার সাথে দেওয়া সর্বশেষ তারিখটাও এক সপ্তাহ আগে পেরিয়ে গেছে। অতপর এই শান্ত বিকেলে হঠাৎ আফফানের উদয় বুকের ভিতর ভয় ছড়িয়ে দেওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ও সঙ্গত।
ছাত্রজীবনে যখন হুজুরের বাসায় দলবেঁধে নিয়মিত যাওয়া হতো, তখন আফফান ছিল খুবই ছোট। চার পাঁচ বছরের শিশু। সেই আফফান এখন বড়ো হয়েছে। দাওরায়ে হাদীস শেষ করে দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদে ইফতা পড়ছে। খুবই শান্ত শিষ্ট, শরীফ মেজাজের সমঝদার একজন তরুণ। ফলে, এখন সেও বুঝে পলাতক একজন লেখককে ধরে ফেলার পর প্রথমেই লেখার কথা বলতে নেই। তার আগে এটা সেটা কুশল বিনিময় ইত্যাদি সেরে নিতে হয়। সে কারণেই হয়তো সে জিজ্ঞেস করল:
- ইদানিং কী লিখছেন? বইমেলায় কি কিছু আসবে?
- মনে হয় না। মানে, এরকম কোনো আলামত দেখছি না আসলে।
- আসা তো উচিত।
- আমার আসলে লিখতে মন চায়; কিন্তু লেখার জন্য বসতে ইচ্ছা করে না। এটা একটা খুবই হাস্যকর একটা পরিস্থিতি। হা হা...। কিন্তু সত্য এটাই। আমি এই চক্কর থেকে বের হতে পারছি না।
- কেন?
- পড়াশোনা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে বলতে পারো আমি পুরোপুরি প্রবৃত্তি নির্ভর। ক্লাসের পড়াশোনার বাইরে আমার অনেক কিছু পড়তে ও জানতে ইচ্ছা করে। কখন কি জানতে ইচ্ছা করবে, সেটা আগে থেকে বলা মুশকিল। এরপর মন যখন কোনো এক দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন মারধর করেও আর সেখান থেকে সরিয়ে আনা যায় না। কোনোটাই কিন্তু ছোটখাটো বিষয় না। কোনো সময় অলংকারশাস্ত্র, কোনো সময় ফিকহের মূলনীতি, কখনো আকীদা, হাদীস, তাফসীর, ইতিহাস, ভূগোল, মহাকাশ, মানুষের শরীর, ব্যাকরণ, বাস্তুতন্ত্র, কবিতা, আরো কত কিছু। আর, এ জাতীয় বিষয় কখনো শুধু পড়ে হয় না। সাথে সারসংক্ষেপ লিখতে হয়। কিন্তু আমাদের জীবনে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আছে, দায়িত্বের চাপ ও সময়ের সংকট আছে। ফলে, কোনোটাই ভালো কোনো পরিণতিতে পৌঁছাতে পারে না। বেশ কিছু বিষয় ও কাজ কিছু দূর গিয়ে থমকে আছে।
একটু আগে যে বললাম, লেখতে বসতে মন চায় না, তো এটা হলো ধরো, ফরমায়েশি লেখা বা পত্রপত্রিকায় প্রকাশযোগ্য কোনো লেখা কিংবা বই করার মতো বিষয়ভিত্তিক রচনা। আর না হয় আমি লেখি না যে, বিষয়টি এমন নয়। প্রায় প্রতিদিনই লেখি। বাইরে বলতে গেলে বের হই না, লোকজনে সাথে গল্পটল্প এসবও সাধারণত করা হয়ে ওঠে না। আমি ঘরকুনো মানুষ। সব সময় রুমেই থাকি। এবং দরসের পড়াশোনার বাইরে বাকি সময়টুকু এমন শিশুসুলভ কামকাজ করে বেড়াই। এসবের কোনো অর্থ হয় না আসলে। তা, তুমি কী বিষয়ে লিখতে বলছিলে যেন?
- আমাদের সাহিত্য চর্চা: ....
আফফান শিরোনামটা বলেছিল, এখন আর পুরোটা মনে আসছে না। তবে এটুকু মনে আছে—সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে জরুরী কিছু বিষয়ে আমি যেন দৃষ্টি আকর্ষণ করি। উপদেশ ও পরামর্শ টাইপ। আমি হাসলাম। প্রকাশ্যে হাসলাম যতটা, মনে মনে হাসলাম তারচেয়ে বেশি। বললাম:
- মানে, আমি পরামর্শ দিব? লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি নিজেই তো তালপাতার সেপাই। সে যাক, যাই লিখি, লেখা একটা দিবই দিব, ইনশাআল্লাহ।
- ঠিক আছে। তবে, কালকের ভিতরে যদি না পাই, পরশু দিন আবার হাজির হব।

আফফান এমন একটা জোরালো হুমকি দিয়ে চলে গেল।

এখন সত্যিই যদি কোনো উপদেশ দিতে হয়, তাহলে আমি এটাই দিব—যারা সত্যিকারের লেখালেখি করতে চান, তারা পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে আমার মতো লাগামহীন হলে হবে না। কারণ, এর ভালো কোনো ফলাফল নেই। শেষ পর্যন্ত কিছুই হয় না। আধা খেচড়া এই জানাটা যেমন কাজে লাগানো যায় না, তেমনি লেখালেখিটাও কোনো পরিণতি পায় না। আমাদের জীবনে সময় খুব কম। কোনো লক্ষ্য ও মাত্রা ছাড়া আজকে এটা তো কালকে সেটা—পড়ালেখার নাম দিয়ে এমন করে প্রবৃত্তির পেছনে ছুটতে থাকলে এক সময় দেখা যাবে, সময় ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
বিশেষ করে এখন বেশিরভাগ পরিণত মানুষের হাতেই মোবাইল ইন্টারনেট। চাইলেই যে কোনো বিষয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘাঁটাঘাটি করা যায়। জ্ঞানের তৃষ্ণা ও পড়ার নেশা থাকলে খুব সহজে মানুষ এই ফাঁদে পড়ে যেতে পারে। ফলে, আধুনিক এই সময়ে এসে তরুণ লেখকদের জন্য এ জায়গাটিতে বিশেষ সতর্কতার একটা ব্যাপার সম্ভবত আছে। ইচ্ছা হলেই কোনো বিষয়ে কোনো বইয়ে বা গুগল ইউটিউবে তিন ঘণ্টা সময় দিয়ে দিব—এটা না করে নিজেকে প্রশ্ন করা দরকার যে, আমি আসলে কী চাই। এখানে সময় দেওয়াটা আমার জন্য কতটা জরুরী। বা বিষয়টা মৌলিকভাবে জরুরী হলেও আমার জ্ঞান, মেধা, সময় ইত্যাদি বিবেচনায় এ ক্ষেত্রে ভালো একটা পরিণতিতে পৌঁছাতে পারব কি না।
দশ লক্ষ টাকা দিয়ে পাঁচ তলা বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশন দিয়ে দেয়াল আর ছাদহীন ঘর বানিয়ে বসে থাকার চেয়ে হাফওয়াল দিয়ে চমৎকার টিনের ঘর বানিয়ে পরিবার নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস শুরু করা বুদ্ধিমানের কাজ। দোয়া করি আমার ও আমার মতোন তালপাতার সেপাইদের ঘটে আল্লাহ যেন এই বুদ্ধিটুকু অন্তত দান করেন।

ট্যাগ: #আলাপ
📤 লেখাটি শেয়ার করুন:
Facebook WhatsApp
পাঠক প্রতিক্রিয়া: 👁️ -- পঠিত