✨ GEMINI LIVE
🗓️ --
-- : -- : -- --

আফফান লাবীব

লাবীবের খেরোখাতা · চিন্তা ও পাঠের নিভৃত আঙিনা

ইফতার প্রথম ফাতরার আমলনামা

আফফান লাবীব আফফান লাবীব আফফান লাবীব
আফফান লাবীব তাখাসসুস ফিল আদব ও ইসলামিক স্টাডিজ
· ১১ মিনিটে পাঠ্য · 👁️ --

ছুটি শেষ। ভাবলাম যাওয়ার আগে জনগণের সামনে কিছু আমলনামা পেশ করে যাই!

•
আমাদের প্রথম বর্ষে তামরীন নেই বললেই চলে। নাই বললে ভুল হবে। শেষ ফাতরায় ১৫ টা তামরীনের নেসাব আছে। হ্যাঁ, প্রায় সাড়া বাংলাদেশ যেখানে বছরে ৩০০ তামরীন করে, সেখানে আমাদের নেসাবই মাত্র পনেরটা। তাও সেটা পূর্ণ করতে পারছেন ইতিহাসের খুব কম ছাত্রই। আসলে আমাদের এখানে কোয়ান্টিটির চাইতে কোয়ালিটির প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। এজন্যে নেসাব অল্প হওয়া সত্ত্বেও সেটা পূরণ করার তৌফিক খুব কম লোকেরই হয়।

যাইহোক, সেটা তো বছর শেষের আলাপ। আমি তো মাত্র এক ফাতরা পার করলাম। আপাতত এটার কথাই বলি।
বছরের শুরুতেই হুজুররা হুমকি দিয়ে আসতেছিলেন, দুই বছরের মধ্যে এই ফাতরার নেসাবই সবচেয়ে দীর্ঘ। তাই ধারাবাহিক না পড়লে পরীক্ষার আগে পৃষ্ঠা উল্টায়াও নেসাব শেষ করা যাবে না। প্রথম প্রথম তো কানে নিই নাই। নিজের মতো করে পড়তেছি। আসলে কোন কিতাব রাইখা কোনটা পড়ব সেটাই বুঝে উঠতে পারি নাই৷ যেই বিশাল কিতাবের তালিকা। এগুলা মুখস্ত করতেই সপ্তাহ গেছে।

প্রথম সপ্তাহ দশদিন গেছে তাআরুফ আলাল কুতুবের ওপর। পুরা মাকতাবার কোথায় কোন কিতাব আছে, কোন জনরার কিতাব কই রাখা, উর্দু কিতাবাদি কই ইত্যাদি। সেই সাথে কিতাবাদির সাথে পরিচয়টাও জরুরি। এজন্যে এই বিষয়ের বইপত্রও মুতালাআ দরকার। টেবিলে লখনবী রহ এর الفوائد البهية আর বাংলাদেশের মাওলানা আবু সাহবান আব্দুল মালেকের التحفة السنية রাখলাম। এই দুইটাতে বিশেষত লাস্টেরটাতেই প্রথম কয়েকদিন গেছে। সাথে মাকতাবার কিতাবগুলোর সন ভিত্তিক একটা তালিকাও করার চেষ্টা করছি।
এরপর আস্তে মানহাজের দিকে নজর দিলাম। দিনে দরস হয় চারটা। ফজরের পর فقه اهل العراق। যোহরের আগে الاشباه والنظائر। দুপুরে شرح الوقود আর الدر المختار। সপ্তাহে একদিন দুররে মুখতার এর মুকাদ্দিমা। বাকি টাইমগুলোতে মুতালাআ। আর রাতে দশটার পর দৈনিক মুহাসাবা পেশ করতে হয়।

সবচেয়ে বড় অংশ ছিল, امداد الفتوی আর امداد الاحکام এর নেসাব। এটার কথাই উস্তাদ বারবার বলতেছিলেন যে বছরের শুরু থেকে না পড়লে শেষে পৃষ্ঠা উল্টানোরও টাইম পাবা না। হইছেও তাই, ইমদাদুল আহকাম কোনো মতে শেষ করতে পারলেও ‘ফতোয়া’ প্রায় এক তৃতীয়াংশই বাকি ছিল। এই দুইটার পরীক্ষাও আবার একবারে হয়। প্রশ্নও করছেন আমাদের মুশরিফ মুফতী মাহবুবুর রহমান সাব। হুজুর অনেক সময় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেন। লেখা কম দেন কিন্তু পায়জামা টাইট করে ছাড়েন। কিভাবে যে দিছি এই পরীক্ষাটা সেটা আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন।

এছাড়া আরেকটা বড় ঝামেলা ছিল الفكر السامي। বইটা মূলত ইসলামি ফিকহের ইতিহাস, কাল, মাযহাব ইত্যাদি নিয়ে লেখা। দুই খন্ড থেকে মুন্তাখাব প্রায় সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার নেসাব। বিক্ষিপ্ত নানান আলোচনার খোলাসা করে পড়তে হয়। না হয় কিচ্ছু মাথায় থাকে না। লেখকের ভাষাও খুব গোছালো এবং সহজবোধ্য না। ফলে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। তবে অনেক আনোখা আলোচনা করেছেন মাশাল্লাহ। বিশেষত ইসলামি ফিকহের সংস্কার এবং আধুনিকায়ন নিয়ে আলাপগুলো।

এর কাছাকাছি আরেকটা কিতাব ছিল, أبحاث حول أصول الفقه الٕاسلامي। পুরো মানহাজে যে কয়টা কিতাবের ব্যাপারে মনে হইছে– এগুলো কয়েকবার পড়া উচিৎ, এটা সেগুলোর একটা। উসূলে ফিকহের ওপর মাস্টারপিস একটা বই। লেখকের ভাষা, আলোচনার ধরন, বিন্যাস— সবকিছুই অসাধারণ। দুইবার বিলইস্তিয়াব পড়ছি। তারপরও মনে হইছে আরেকটু ভালো করে পড়া দরকার। এই দুই কিতাবের পরীক্ষা ছিল একসাথে। আমরা আবহাছকে মূল কিতাব ধরে ফিকরে সামীকে তাবে’ মনে পড়ছি। কিন্তু হলে গিয়ে দেখি পুরা উলটা। আবহাছ থেকে আসছে মাত্র এক সুয়াল আর বাকিটা ফিকরে সামী থেকে। কট।

মানহাজের আরেকটা ভালো কিতাব ছিল তাকী সাহেবের أصول الإفتاء। এইটাও কয়েকবার পড়ার মতো। বাসায় যে নুসখাটা ছিল, সেটার নিচে মালিবাগের মুফতি হারুন সাহেবের একটা বহুত লম্বা তা’লীক আছে। الفتح الرباني। যেটার কারণে মূল কিতাব তিনশো পৃষ্ঠা থেকে সাতশো পৃষ্ঠা হয়ে গেছে। আমরা সাথিরা অনেক ফিকির করে উদ্ধার করছি যে এই তা’লীকে হারুন সাহেব ওনার সারাজীবনের সব ইলমী নোট জমা করছেন। মতনের সাথে তাই ন্যূনতম সম্পর্কের ভিত্তিতে উনি এমন অনেক কথা উল্লেখ করছেন, যেটা না করলে কারু কোনো ক্ষতি হইত না। যাইহোক, আমার মনে হয় যারা অবসর সময়ে এই কিতাব পড়বেন, তাদের জন্যে এই হারুন সাহেবের এই তা’লীকটা অনেক কাজে দিবে। অন্যথায় শুধু মূল কিতাব পড়লেই হবে। আর তাকী সাহেবের এই ধরনের কিতাবাদির আদতে কোনো শরাহের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না।
উসুলে ইফতার সাথে দরসি শরহে উকুদের পরীক্ষাও হইছে। আসলে হুজুরের কিতাবটা পড়লে আর শরহে উকুদ পড়ার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন থাকে বলে মনে করি না। উলটা যেহেন আরো বিক্ষিপ্ত হওয়ার আশংকা থাকে। কিন্তু নেসাবে আছে বলে না পড়ে তো উপায় নাই।

এর পরে حاشية الطحطاوي على المراقي। দীর্ঘ তিনশো পৃষ্ঠার আরেকটা বিশাল সমুদ্র। ভাগ ভাগ করে পুরো তিন ফাতরায় শেষ হবে এটা। এই কিতাব ভালো করে পড়লে অনেক মাওয়াদ পাওয়া যাবে। ফিকহের অনেক সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম বিষয় বিভিন্ন এবারতে ফাঁকে ফাঁকে উনি ছড়ায় ছিটায় রাখছেন। আবার অনেক জায়গায় বেশি গভীরে যাইতে গিয়া তাকাল্লুফি করছেন। হক মুতাবেক পড়ার মতো সময় হাতে ছিল না। তাই নেসাব টেনেটুনে শেষ করতে হইছে। একেবারে শেষ হইছে বলাও মুশকিল।

প্রতি বছরই কিছু কিতাব এমন থাকে, যেগুলো পড়লে তালেবে ইলমদের গুনাহ মাফ হয়। কারণ এগুলোর পেছনে যে পরিমাণ মেধা শ্রম আর সময় ব্যয় হয়, আবু হানীফা রহ. থাকলে এই সময়ে হাজার খানেক মাসআলা ইজতিহাদ করতে পারতেন। আমাদের পুরো বছরের ওপর চাপায় দেয়া সেই কিতাবখানা হইল كنز الدقائق। আসলে পেরেশানির মূল কারণ হইল, এই কিতাবটার পরীক্ষা হয় মৌখিক। মানে প্রতি ফাতরার নির্ধারিত অংশ মুখস্ত করে হুজুরের কাছে যাইতে হয়। একে তো কিতাবটা মাত্রাতিরিক্ত সংক্ষিপ্ত। এবারতে কী কইছে সেইটা উদ্ধার করাই মুশকিল। তার উপর আবার মুখস্ত করার প্যারা। মানে এমনভাবে পড়তে হবে যেন অধ্যায়ের নাম বললেই গড় গড় করে শুনায় দিতে পারি কোন পৃষ্ঠায় কী আলাপ আছে। আমার কাছে যে নুসখাটা আছে সেটা ডক্টর সাইদ বাকদাশের তাহকিককৃত। একেবারে শুধু টেক্সট। যৎসামান্য জায়গা ছাড়া কোনো হাশিয়া বাইনাস সতর নাই। এজন্যেই শুরুতে বলছি যে এই কিতাব পড়লে ছাত্রদের গুনাহ মাফ হয়।
পরীক্ষা বাদে শুধু মুতালাআয় ছিল আলী মিয়া নদভী রহ. এর مطالعہ قرآن کے اصول و مبادی। ছোটখাটো কিন্তু চমৎকার কিতাব। ঝরঝরে প্রাঞ্জল ভাষায় দারুন শাস্ত্রীয় আলোচনা করেছেন। বইটা সবার জন্যেই পাঠ্য।

•
যাওয়ার আগে ছোট্ট করে ছুটির আমলনামাও দিয়ে যাই। মূলত এই ছুটিতে দুইতিনটা কাজের প্ল্যান নিয়ে আসছিলাম। হইছে মনে হয় দেড়টা। মুজিব ভাইয়ের একটা নির্দেশ ছিল সেইটা পূরণ করছি। শামাদানের জন্যে একটা লেখা তৈয়ার করতে চাইছিলাম সেটার মাওয়াদ জমা হইছে কিন্তু লেখায় হাত দিতে পারি নাই অলসতার কারণে। আরেকটা বড় কাজ ছিল ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়াকে নিয়ে পড়া। সামনের সাহিত্য মজলিসের লেখার বিষয় এটা। এটা শুরুই করতে পারি নাই।
ফাঁক দিয়ে একটা বাড়তি ভালো কাজ হইছে সেটা হলো একটা চাপে পড়ে আবদুল মান্নান সৈয়দের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান বইটা প্রায় অর্ধেক পড়া হইছে৷ আগে থেকেই খাহেশ ছিল কিন্তু একটা ফাঁদে পড়ে এবারই পড়তে হইছে।
যাইহোক খুচরা অনেক আলাপ হইল। সামনে নতুন মানহাজ আসবে, যেন এবার আর আগের মতো আলসেমি ভন্ডামি না করি, সময় ঠিকঠাক কাজে লাগাতে পারি— সেই দোয়ার প্রত্যাশায়।

৩১ জুলাই ২০২৬ ঈসায়ি
শুক্রবার

ট্যাগ: #আলাপ
📤 লেখাটি শেয়ার করুন:
Facebook WhatsApp
পাঠক প্রতিক্রিয়া: 👁️ -- পঠিত