তারীখে আরদুল কুরআন আল্লামা সায়্যিদ সুলাইমান নদভীর জগদ্বিখ্যাত একটি গ্রন্থ। তাত্ত্বিক বিচারে এটিকে তাঁর ঈর্ষণীয় সাফল্যও বলা চলে। কুরআনুল কারীমে স্পষ্টভাবে অথবা ইঙ্গিতার্থে ভূমি সংক্রান্ত যে সকল আলোচনা করা হয়েছে— সেগুলোর প্রাচীন ও আধুনিক জিওগ্রাফি এবং ইতিহাস এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়। সেই সঙ্গে এতে ওই সকল অঞ্চল ও তার অধিবাসীদের বিস্তারিত পরিচয়ও উঠে এসেছে। বস্তুত এটি চূড়ান্ত দুর্বোধ্য বিষয় কারণ, এতে ওই সকল শহর-নগর গ্রাম-গঞ্জ ও সভ্যতা-সংস্কৃতির বর্ণনা এসেছে— যা বহুকাল পূর্বেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে; নাম-চিহ্ন পাল্টে গেছে এবং যেগুলোকে গ্রীক ও ইউরোপীয় লেখকগণ নিজস্ব মতামত দ্বারা দুঃসাধ্য করে তুলেছেন। কিন্তু আল্লামা সায়্যিদ সুলাইমান নদভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেই দুঃসাধ্য বিষয়গুলোকেই নির্মলরূপে উপস্থাপন করেছেন।
ভৌগলিক ও পূর্বেকার জাতিসমূহ নিয়ে আলোচনা করা যেহেতু আমার বিষয়বস্তু নয়, তাই এই গ্রন্থের যথার্থ পর্যালোচনা করাও আমার পক্ষে দুষ্কর। তবে সাধারণ একজন জ্ঞানানুরাগী হিসেবে আমি এ কথা বিনা সংকোচে বলতে পারি– এই গ্রন্থের প্রতিটি পাতা-ই তথ্যের ব্যাপকতা ও ইতিহাসের বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে সম্মানিত লেখকের সুক্ষ্মদৃষ্টি ও ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের সাক্ষ্য দেয়। আল্লামা নদভী রহমতুল্লাহি আলাইহি এই গ্রন্থ রচনাকালে সংশ্লিষ্ট সকল আরবি ও ইংরেজি উৎসসমূহের সহায়তা নিয়েছেন। এমনকি এর জন্য তিনি হিব্রু ভাষার প্রাথমিক দক্ষতাও অর্জন করেছিলেন। এবং বিভিন্ন জায়গায় প্রামানিক ও ভদ্রতাপূর্ণ সমালোচনাও করেছেন।
লেখক মহোদয় আধুনিক কালের অনুসন্ধানগুলোকে কুরআনের একজন সেবকরূপে উপস্থাপন করেছেন এবং ক্ষেত্রবিশেষে দেখিয়ে দিয়েছেন– এই অনুসন্ধান কিভাবে কুরআনের যথার্থতার সত্যায়ন করে। এভাবেই কুরআনের ভূমি সংক্রান্ত জিওগ্রাফি ও ঐতিহাসিক তথ্য সমৃদ্ধ এই বই শুধু উর্দুতেই নয়, বরং আরবি ও ইংরেজি ভাষার বিচারেও এই গ্রন্থ অদ্বিতীয়।
তবে এই গ্রন্থটি মাওলানা নদভীর হযরত থানভীর হাতে বায়আত গ্রহণের পূর্বেকার রচনা। তাঁর সে সময়কার বহু লেখাতেই উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত মতের সঙ্গে কিছু বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। পরবর্তীতে বায়আত গ্রহণের পর তিনি একটি সাধারণ ঘোষণার মাধ্যমে সেসব বক্তব্য থেকে অব্যাহতি প্রকাশ করেছিলেন। যদিও গ্রন্থসমূহের সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশের পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় এই গ্রন্থেও এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা উম্মতের জমহুর উলামায়ে কেরামের মতের পরিপন্থী। উদাহরণস্বরূপ—সে যুগে স্যার সৈয়দ আহমদের প্রসিদ্ধ প্রকৃতিবাদী মতাদর্শের ব্যাপক প্রভাব ছিল। যার ভিত্তিতে পাশ্চাত্য দর্শনে প্রভাবিত একশ্রেণির লেখকগণ নবীগণের মুজিযাসমূহ অস্বীকার করতে শুরু করেন। কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত মুজিযাগুলোকে পার্থিব বা প্রাকৃতিক বলে সাব্যস্ত করার উদ্দেশ্যে কুরআনের শব্দ ও বক্তব্যে নানারকম টানা-হেঁচড়ারও প্রচেষ্টা চলছিল।
অন্যদিকে সে সময় কিছু লেখকের প্রবণতা এমন ছিল যে, তারা মৌলিকভাবে মুজিযাসমূহ অস্বীকার না করলেও যথাসম্ভব সেগুলোকে সীমিতভাবে গ্রহণ করতে চাইতেন। তাদের চেষ্টা ছিল—কুরআনে বর্ণিত এজাতীয় ঘটনাবলিকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ও টালবাহানার মাধ্যমে অলৌকিকতার অবস্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া। ফলে তারা মুজিযাসমূহকে সরাসরি অস্বীকার না করলেও, কুরআনের কিছু আয়াতের ক্ষেত্রে দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। সায়্যিদ সাহেবের এই গ্রন্থে সেই সকল লেখক দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার বিষয়টি আঁচ করা যায়। উনি কিছু ক্ষেত্রে স্যার সৈয়দ আহমদের ব্যাখ্যাসমূহের সরাসরি খন্ডন করেছেন, আবার কিছু জায়গায় সেই চিন্তা-ভাবনা থেকেই দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। যেমন– কুরআনে আসহাবুল ফীলের ঘটনা স্পষ্টভাবে এভাবে বর্ণিত আছে– আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুদরতে তাদের উপর এক ঝাঁক পাখি পাঠালেন; যেগুলো পাথর বর্ষণ করে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। কিন্তু মুজিযাকে এড়িয়ে চলার মনোভাব এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় এমন এমন অসারতা তৈরি করেছে– অবাক না হয়ে পারা যায় না।
স্যার সৈয়দ আহমদের ব্যাখ্যা সম্পর্কে তো মুহতারাম লেখক বলেছেন– “স্যার সৈয়দ আহমদ এই আয়াতের যা ব্যাখ্যা করেছেন এবং যেভাবে এই ঘটনার অলৌকিকতাকে প্রতিহত করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন সেটা সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন।”
কিন্তু একটু পর লেখক নিজেও এই আয়াতে মাওলানা হামিদ উদ্দিন কর্তৃক এই তাফসিরকে সমর্থন করেছেন– পক্ষীকূল দ্বারা নয় বরং মানুষদের মাধ্যমে পাথর বর্ষণ করে আসহাবুল ফীলকে ধ্বংস করা হয়েছিল আর পাখির এই ঝাঁক তাদেরকে ধ্বংসের জন্যে আসেনি; বরং তাদের লাশগুলোকে ভক্ষণের জন্য এসেছিল।
যাই হোক মাওলানা ফারাহীর এই ব্যাখ্যা কুরআনুল কারিমের পূর্বাপর, যুক্তি ও বর্ণনা— সব বিচারে সম্পূর্ণ ভুল এবং উলামায়ে কেরামের মতের বিপরীত। তাছাড়া মুজিযাকে এড়িয়ে চলার একরোখা মনোভাব ছাড়া এই ব্যাখ্যা গ্রহণের দ্বিতীয় আর কোনো কারণও আমি দেখতে পাই না।
যাই হোক,গুটি কয়েকটি উদাহরণ দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল– আল্লামা নদভীর এই গ্রন্থ তাফসীরের ক্ষেত্রে বিচার-বিশ্লেষণের সেই মাপকাঠি অক্ষুণ্ন রাখেনি; যেটা ইতিহাস ও ভৌগোলিক বিষয়ের ক্ষেত্রে বহাল থেকেছে।
আর বাহ্যিক দৃষ্টিতেই এটা অনুধাবন করা গিয়েছে– মুহতারাম লেখক (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) উম্মাহর সকল আলেমের মতের বিপরীতে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনরূপ দ্বিধাবোধ করেননি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই তিনি স্বতন্ত্রতা বেছে নিয়েছেন।
আর আমরা যেমনটা পূর্বেই বলে এসেছি– এই গ্রন্থ মুহতারাম লেখকের প্রাথমিক জীবনের। পরবর্তীতে তিনি নিজে এ জাতীয় বক্তব্য থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। রাহিমাহুল্লাহ।